
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ
- আপলোড সময় : ২৩-১১-২০২৪ ০১:১১:২৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৩-১১-২০২৪ ০১:১১:২৯ পূর্বাহ্ন


আইন ও সালিশ কেন্দ্র
গত তিন মাসে গণপিটুনিতে খুন হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন। এসময়, ধর্ষণের ঘটনা ৭৮টি। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুরাও হামলার শিকার হয়েছেন
আতাউর রহমান জুয়েল
গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। নতুন সরকারের সামনে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। তার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় জনমনে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গার্মেন্টস শ্রমিক, অটোরিকশা চালক, নার্স, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের নানা দাবিতে আন্দোলন। গত ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পুলিশের অনুপস্থিতি এবং পরিবর্তীত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ভুক্তভোগী এবং সাধারণ মানুষ সবাই বলছেন অপরাধ দমনে সরকারকে ‘আরো কঠোর’ হতে হবে। তবে সফলভাবে মোকাবিলা করছে সরকার। অচিরেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে দেশÑ এমন আশা পোষণ করে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সেনাসদর জানিয়েছে সেনাবাহিনী দেশের সাত শতাধিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। লুট হয়ে যাওয়া ৬ হাজার অস্ত্র দুই লক্ষাধিক গুলি উদ্ধার করেছে এবং এতে সম্পৃক্ত আড়াই হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। ব্রিফিংয়ে সেনা সদরের কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার খান বলেন, পরিস্থিতি আরো উন্নতির জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করছে সেনাবাহিনী। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পাওয়ার পরের যে স্ট্যাটিস্টিক সেটাতে আগের তুলনায় অপরাধের নথিভুক্ত রেকর্ডের সংখ্যা কমেছে।
সিদ্ধিরগঞ্জের ইজিবাইক চালক মোহাম্মদ শামীম। ঋণ করে কেনা শামীমের ইজিবাইকটি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ছিনতাই করেছে ছিনতাইকারিরা। অজ্ঞান করে ছিনতাইকারি লুটে নেয়া হয় তার আয় রোজগারের একমাত্র অবলম্বন। তিনি বলেন, রাতে গাড়ি নিয়ে বাইর হইতে অনেক মানুষের কষ্ট হচ্ছে। মানে ভয় পাইতেছে। কারণ কখন কোন দিক দিয়া আসে, ছুরি আঘাত করে, আহত করে বা নিহত করে। গত তিনমাসে ডজনের বেশি ইজিবাইক ছিনতাই হয়েছে, এর মধ্যে চারজন চালককে খুন করা হয়েছে।
সারাদেশে ইজিবাইক চালকদের মধ্যে একটা ছিনতাই আতঙ্ক কাজ করছে বলেও জানান শামীম। কারণ চলতি নভেম্বর মাসের দুই সপ্তাহে রূপগঞ্জ, নরসিংদি, কিশোরগঞ্জ, ঝিনাইদহ জেলায় চালককে হত্যা করে ইজিবাইক ছিনতাই হয়েছে।
এদিকে, বিভিন্ন জায়গায় মব জাস্টিস সৃষ্টি করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে জনমনে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সানাড়পাড় বাস স্ট্যান্ডে গত ১০ নভেম্বর রোববার এক পুলিশ সদস্যকে ‘ভুয়া পুলিশ’ আখ্যা দিয়ে গণপিটুনি দেয়া হয়েছে। এব্যাপারে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পুলিশ জানায়, তিনি বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য। পকেটমার ভুয়া পুলিশ গুজব ছড়িয়ে দিলে তিনি গণপিটুনির শিকার হন।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আল মামুন জানান, গত ৫ আগস্টের পর এক মাসের মতো পুলিশের অনুপস্থিতি অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। নিয়মিত পুলিশিংটা আমি আসার আগ পর্যন্ত বন্ধই ছিল। সেপ্টেম্বরের সাত তারিখে আমি জয়েন করার পর আস্তে আস্তে পুলিশিংটা দৃশ্যমান হয়েছে। এখন আমরা ফুল ফিল্ডওয়ার্কে আছি। আগে চারটা টহল বের হতো এখন যানবাহন সংকটে দুইটা টহল বের হয়। একটা ভাড়া নেই, আরেকটা সরকারি গাড়ি আছে। থানার গাড়িতো পুড়ায় দিছে। এখন সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে টহল এবং পুলিশিং চলছে। আশা করি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
সম্প্রতি রাজধানীতে আলোচিত জেনেভা ক্যাম্প ও মোহাম্মদপুর এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি। জেনেভা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় প্রকাশ্যে ছিনতাই, ডাকাতি, খুনোখুনি, সশস্ত্র মহড়া দিতে দেখা যায় প্রায়ই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান চলছে। জেনেভা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থান থেকে শতাধিক সন্দেহভাজনক আসামি গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু এখনো মানুষের আতঙ্ক কাটেনি।
একজন অভিভাবক জানান, “চলন্ত রিকশা থেকে বয়স্ক একজনের কানের দুলটা ছিড়ে নিয়ে গেছে। রক্ত ঝরছে। এটা দেখার পর থেকে আমার বাচ্চাকে আমি বাসা থেকে হিজাব পরায় নিয়ে আসি, স্কুলের কাছে এসে হিজাবটা খুলি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, “সবসময় আতঙ্কে থাকি। সন্ধ্যার পরে বের হওয়াটা খুব রিস্কি বিষয়। মনে হয় যে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যাই অন্যথায় কোন বিপদে পড়ি। আমরাতো স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। যে সরকারই আসুক, যেই আসুক, আমাদেরকে কেউ খাওয়াবে না, পরাবে না। খাবারটা নিজেই আর্ন করে খেতে হবে। তাহলে আমাদের মূল চাওয়াটা হচ্ছে সেইফটিটা যেন সরকারের থেকে পাই।”
মুদিখানার মালিক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, “২০০০ সাল থেকে ঢাকায় আছি। কখনো আমাদের এলাকার মধ্যে এমন পরিস্থিতি দেখি আই। গণ্ডগোলের পর থেকে যখন এরকম দেখতেছি তখন আতঙ্কতো থাকবেই।” মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কামরূল ইসলাম বলেন, “আতঙ্কে আছি আমরা। আগে রাতে বারোটা একটায় মানুষ যাইতে পারছে বাইরে। এখন তো মানুষ ভয়ের চোটে বাইরায় না। কাজকর্মে অনেক সমস্যা হয়।”
মোহাম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আলী ইফতেখার হাসান বলেন, অভিযানের পর এলাকার পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। আশা রাখি খুব শিগগিরই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তিনি আরও বলেন, গত আড়াই মাসে দুটো ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। দ্রুততম সময় ডাকাতির ঘটনায় আসামি গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা রহস্য উদঘাটন করেছি। কিছু আসামি পলাতক আছে। ঘটনা ঘটতে পারে কিন্তু ঘটনা প্রতিকার পাচ্ছে কি না জনগণ সেটাই হলো বিবেচ্য বিষয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেবে গত তিন মাসে গণপিটুনিতে খুন হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন। এসময়, ধর্ষণের ঘটনা ৭৮টি। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুরাও হামলার শিকার হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারম্যান জেড আই খান পান্না বলেন, আমিতো দেখি হোম মিনিস্টার (উপদেষ্টা) অনেক সময় শুনেও না শোনার ভান করেন, উত্তর দিতে চান না এভয়েড করে যান। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে নাই। পুলিশ অসহযোগিতা করতেছে এতে কোনো সন্দেহ নাই। আনসার ননকোওপারেশন করবে এতেও কোনও সন্দেহ নাই। খোঁজ নিয়ে দেখেন সারাদেশের অবস্থা কী? চাঁদাবাজি চলছে সেই আগের মতো। ইজারাদারি প্রথা আমার জায়গায় আপনি আসছেন আপনার জায়গায় আমি আসছি এই চলতেছে।
সরকারের ঊর্ধ্বতন সূত্রে জানা যায়, নতুন করে পুলিশ ও আনসার নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।র্ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনীকে মাঠে রাখার চিন্তা ভাবনাও আছেবর্তমান সরকারের।নতুন করে সেনাবাহিনীর বিচারিক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কোনো কথা বলেন নি। তবে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এ প্রতিনিধিকে বলেন, আগামী তিনমাসের মধ্যে পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। তিনি আরও বলেন, আমরা আশা করি আগামী তিন মাসের মধ্যে পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারবো। এবং পুলিশ পুরোপুরি ফাংশনাল হবে। তিনি জানান, সে লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় খোদা বক্সকে নিয়োগ করা হয়েছে।
সেনাবাহিনী কবে নাগাদ ব্যারাকে ফিরবে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার চায় সেনাবাহিনী দ্রত ফিরে যাক। তবে পুলিশ সম্পূর্ণভাবে রিভাইভ করা এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ যে বাহিনীগুলো রয়েছে যারা আইনশৃঙ্খলা দেখে থাকে তাদের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি কন্ট্রোলে আসার পরপরই তারা ব্যারাকে ফিরে যাবে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতির বিষয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তবে পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতে ইচ্ছুক নন তারা।
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ